বিশেষ খবর

ধর্ষণ প্রবৃত্তির স্থায়ী প্রতিকারে ফাঁসি কার্যকরের পাশাপাশি ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ ড. এম হেলাল ॥

বর্তমান সময়ের সর্বাধিক আলোচিত-আন্দোলিত বিষয় হচ্ছে নারী ধর্ষণ। এটি আমাদের বিবেকবান সবাইকে লজ্জিত ও স্তম্ভিত করে দিয়েছে। জাতীয়ভাবে এ লজ্জার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম এবং ভাবমূর্তিও নষ্ট করছে। নারী ধর্ষণ একটি জঘন্যতম অপরাধ। যারা ধর্ষণের মতো ঘটনায় জড়িত- তারা মানুষ নয়, পশু। তাইতো আমার মতে, যাদের ঘরে ধর্ষকের জন্ম, তাদেরও দায় রয়েছে ধর্ষণের জন্য। আমার জানা-বোঝায়, ধর্ষণ প্রবৃত্তির শুরু অসুস্থ পরিবার থেকে বিশেষত ভারসাম্যহীন মা-বাবার থেকে। অর্থাৎ ধর্ষকরা কোনো সুস্থ পরিবারের নয়, এমনকি ধর্ষকরা কোনো দলেরও লোক নয়। এরা দলের অধীন থাকলেও ঐ দলের আদর্শচ্যুত, পরিবারচ্যুত, সমাজচ্যুত ও পথভ্রষ্ট নিষ্ঠুর অমানুষ। এরা ক্ষমাহীন চরম অপরাধী বিধায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার সাপেক্ষে এদের জন্য মৃত্যুদন্ডের চরম বিধান ছাড়া অন্যকোনো উপায়ও নেই।

ধর্ষণে ফাঁসি যেমনি জরুরি, তেমনি ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের মূল কারণ উদঘাটন আরো জরুরি। এরূপ লোমহর্ষক অপরাধ সংঘঠনের নেপথ্যে বাবা-মা’র নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং তাদের কারুর দ্বারা পরিবার-সন্ত্রাস, কুমন্ত্রণা ও ব্যভিচারের শিক্ষা-দীক্ষা; ধর্ষিতা কিংবা নারীর অশালীনতা ও কুমন্ত্রণার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা এবং প্রমাণসাপেক্ষে তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনা। অন্যথায় কেবল ধর্ষণকারীকে ফাঁসি দিয়েও ধর্ষণ কমানো যাবে না বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। এমনকি সরকারের চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বগণও তাই মনে করেন। গত ৯ অক্টেবার ২০২০ দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত বিশেষ একটি সংবাদে দেখলাম- প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং শিশু অধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাসেরও সভাপতি জনাব মোঃ শামসুল হক টুকু সরাসরিই বলেছেন- ‘মৃত্যুদন্ডের বিধান থাকলেই অপরাধ বন্ধ হয় না’। তিনি আরও বলেন- ‘ধর্ষণ একটি জঘন্যতম অপরাধ। ধর্ষকরা কোনো দলের নয়। অপরাধী হিসেবে তাদের বিচার ও শাস্তি হতে হবে। একই সঙ্গে তাদের পরিবারকেও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। কোনো পরিবারে ধর্ষকের মতো পশু থাকলে তা সমগ্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। এতে অভিভাবকরাও সতর্ক হবেন।

ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে আইনের সংশোধন হতে পারে বলে আইনমন্ত্রীও মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেন- আমিও গভীরভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। ধর্ষণে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে -এমন ধারণা সঠিক নয়। খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও হত্যা বন্ধ হয়নি। আবার মৃত্যুদণ্ড নেই এমন দেশে খুনের ঘটনা কম। এখানে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সবচেয়ে জরুরি জনসচেতনতা এবং ধর্ষণের কারণ ও উৎস অনুসন্ধান।’ আইনমন্ত্রী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাঁরা দু’জনে যথার্থই বলেছেন। অপরাধীর অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চয়তা তথা প্রমাণ সাপেক্ষে ঐ অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যেমনি জরুরি, তেমনি এরূপ অপরাধের কারণ ও ক্ষেত্র উদঘাটন করে তা সমূলে ধ্বংস করে দেয়াই প্রকৃত কল্যাণকামী নীতিনির্ধারকের কাজ ও দায়িত্ব। তা না করলে ফাঁসি দিয়ে মা’র বুক খালি করা কিংবা সমাজকে আতংকিতই করা হবে; অপরাধ নির্মূলে কাজের কাজ কিছু হবে না। বরং জঘন্য এ পরিস্থিতিতেও নীতিনির্ধারকগণের কালক্ষেপণ, পাশ কাটিয়ে চলা (Avoidance) এবং ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ এরূপ দৃষ্টিভঙ্গিই পরিস্ফূট হয়ে উঠবে দীর্ঘমেয়াদে।

১৪ অক্টোবর ২০২০ দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদে উপরোক্ত সত্যতাই পরিস্ফূট হয়ে উঠেছে। সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘আন্দোলন আইনেও কমছে না ধর্ষণ’। সংবাদটি সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে তুলে ধরা হলো- ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির দাবির মুখে ১২ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০০’ এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ১৩ অক্টোবর অধ্যাদেশে সই করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। ঐদিনই আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ অধ্যাদেশটি জারি করে। এতসবের মধ্যেই ১৩ অক্টোবরের আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে দশজনকে ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরো তিনজনকে। দুই আলোচিত ঘটনায় আন্দোলনে কঠোর বিচারের দাবি এবং আইন সংশোধনের সময়ও প্রতিদিনই একক ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

এ কারণেই আইনজীবী, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন- শুধু কঠোর আইন করে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যাবে না। এর জন্য সামাজিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদক, পর্নোগ্রাফি, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে অপরাধীদের মদদ বন্ধ করা এবং পুলিশের প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করা গেলে ধর্ষণ কমে আসবে। ধর্ষকদের মনস্তত্ত্বের ব্যাপারে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ সালাউদ্দিন কাউসার বলেন, ‘ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব দুইভাবে প্রভাবিত হয়। এক শ্রেণির ধর্ষক সাধারণ অপরাধের মতোই ধর্ষণ করে। তারা বুঝতেই পারে না এটা বড় ধরনের অপরাধ। তাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এদের পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা থাকে না। আরেক শ্রেণি সচেতনভাবে, পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ করে। চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা গ্যাং বেপরোয়া ধর্ষণ করে। তারা মনে করে, প্রভাবের কারণে কিছু হবে না।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘এখনো যারা ধর্ষণ করে যাচ্ছে, তারা আইনে মৃত্যুদণ্ড হলো কি হলো না, তার তোয়াক্কা করে না। মাদকের আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এদের বেপরোয়া করে তুলেছে। এগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে। যুবসমাজকে গঠনমূলক জীবনাচারে গড়ে তুলে অতঃপর উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক বলেন, ‘শুধু সাজা বাড়িয়ে সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ দূর করা যাবে না। হয়তো কিছুটা কমবে। এ অপরাধ সমাজ থেকে দূর করতে হলে মূলে বা গোড়ায় যেতে হবে। সাজা বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব সমস্যা আছে, তা দূর করতে হবে। সংস্কার আনতে হবে প্রচলিত বিচারব্যবস্থায়।’

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইউম বলেন, ‘ধর্ষণ-নিপীড়ন প্রতিরোধে পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ধর্ষণ হওয়ার আগেই নিপীড়নের ঘটনায়ও যেন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই পুলিশ পারে ধর্ষণ-নিপীড়ন থামাতে। পুলিশে অনেক দক্ষ, ভালো অফিসার আছেন।’ দৈনিক কালের কন্ঠে ২২ অক্টোর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল- ‘বাইরে সশস্ত্র পাহারা, ভেতরে ধর্ষণ’। সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও এর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে দেশ। দাবির মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে সম্প্রতি অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। এর মধ্যেই সেই নোয়াখালীর চাটখিল ও সেনবাগ উপজেলায় আরও দুই নারীকে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।

চাটখিলের নোয়াখোলা ইউনিয়নে ২১ অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে এক প্রবাসীর বসতঘরের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ে এক যুবক। এরপর সেখানে প্রবাসীর স্ত্রীকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে সে। ভুক্তভোগী নারীর দুই শিশু-সন্তানের সামনে এই বর্বরতা চালানো হয়। এসময় অভিযুক্ত যুবকের কয়েকজন সশস্ত্র ক্যাডার ঘরের চারপাশে পাহারা দেয়। তাদের ভয়ে ঘরের ভেতর যেতে সাহস পায়নি বাড়ির লোকজন। পরে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। এমন অভিযোগ এনে চাটখিল থানায় সকালে মামলা করেন ভুক্তভোগী নারী। এসব সংবাদের ও মতামতের প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে- কল্যাণকামী নীতিনির্ধারক, আইন প্রণেতা, তদন্তকারী এবং বিচারক সবারই দৃষ্টি ও লক্ষ্য থাকা উচিত অপরাধ নির্মূলে; কেবলমাত্র অপরাধীকেই শাস্তি দেয়া নয়। আমাদের বিবেকবান সবারই উচিত অপরাধকে ঘৃণা করা, অপরাধীকে নয়।

একজন মানুষের মধ্যে ১টা কিংবা ১০টা অপরাধ থাকলেও তার মধ্যে ৯৯টা কিংবা ৯০টা গুণ থাকাই স্বাভাবিক। তাই আমরা ক্ষমতাবান কিংবা দায়িত্ববানরা সেই সত্য ভুলে গিয়ে অপরাধের প্রতি ঘৃণ্য আবেগে পড়ে ঐ ১টা দোষের সমাধির পাশাপাশি তার মধ্যে থাকা ৯৯টি গুণকেও সলিল সমাধি দিয়ে ফেলি, তা কোনো কৃতিত্বকর্ম বলে আমি মনে করি না। বরং অপরাধের মূল ও পারিপার্শ্বিক কারণে গিয়ে অপরাধ সংঘটন সংশ্লিষ্ট সবাইকেই আইনের আওতায় আনা এবং অপরাধ নির্মূলে ও প্রতিরোধে কাজ করা তথা অপরাধের মূল উৎপাটনে অধিকতর সিরিয়াস হওয়ার নিশ্চয়তা বিধান অধিক জরুরি। কারণ একজন যখন খুন বা ধর্ষণ করে, তখন সে জেনেই তা করে যে- এতে ধরা খেলে তার কঠিন শাস্তি হবে। তবুও সে তা করে এই চেতনা থেকে- মরলেই বা কি। আমি মরতে হয় মরব, তবুও এ কাজটি করব। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড, ফাঁসি এসবে তার তোয়াক্কা নেই। অপরদিকে এসবের প্রতি তোয়াক্কা আছে বলেই এবং অন্যকথায় মরে যেতে চাই না বলেই আমরা সুবোধরা ঐ অপরাধে কিংবা জিঘাংসার পথে যেতে চাই না কিংবা যাই না।

আমরা নিজ জীবন রক্ষার প্রতি যত্নশীল,
আর খুনী ও ধর্ষক তার জীবন রক্ষার প্রতি উদাসীন।

তাই যেই মানুষের কাছে নিজ জীবনের প্রতি মায়া নাই, যেই মানুষ তার জীবন রক্ষায় উদাসীন কিংবা জীবন বিসর্জনে প্রস্তুত, তাকে আমরা তার সেই মনোবাঞ্চনা ও মনোবৃত্তি পূরণে সাহায্য-সহযোগিতাদান করলে কি সমাজে অপরাধ কমবে, নাকি বাড়বে? এর উত্তর সুশীল পাঠকের কাছ থেকে চাই। তা চাওয়ার জন্য কৃত অপরাধের ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি- কেবলমাত্র সত্য ও সুন্দরের অনুসন্ধানের জন্য এবং সৎ-ন্যায়নিষ্ঠ-সুন্দর সমাজ গড়ার চিন্তায় সবাইকে আহ্বান করার প্রয়াসে। খুনী ও ধর্ষক মরতে চেয়েছে, আর আমরা তাকে মরার পথেই নিয়ে গেলাম -এতে একদিন আমাদের সন্তানকে, আমাদের আরেক ভাইকেও হারানোর পথ তৈরি কিংবা প্রশস্ত করে যাচ্ছি আমরা।

তাই আমাদেরকে মূল অপরাধের জন্য ধর্ষক ও খুনীর মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি অধিক জোর দিতে হবে, লক্ষ্য রাখতে হবে ঐ অপরাধ সংঘটনে কী কী কারণ, কী কী ইন্ধন, নেপথ্যে কী কী পরিবেশ-পরিস্থিতি কাজ করেছে। সেই অভিযোগ-অপরাধগুলোকেও শাস্তির আওতায় এনে অন্ততপক্ষে তিরস্কৃত করা, যা অপরাধ নির্মূলের মাধ্যমে সত্য-সুস্থ-সুন্দর সমাজ নির্মাণের জন্য সবিশেষ দরকার। সেইরূপ মৌলিক কর্ম কিংবা পদক্ষেপ ইতিহাসে অনন্য কর্ম ও কালান্তরে সভ্যতার সাক্ষী হয়ে আমাদেরকে অভিনন্দিত করতে থাকবে। আর তা না হলে আগামীতেও যত ধর্ষণ ও খুনের বদলায় খুন ও ফাঁসি হতে থাকবে, ততই ঐ খুনীর মা-বাবার আত্মা আমাদেরকেও অভিসম্পাত করতে থাকবে- বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দায়িত্বে পাশ কাটানো এবং অযথা সময় অতিবাহিত করার জন্যে। খুন ও ধর্ষণ বিরোধী মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চাইলে আমাদেরকে সর্বাগ্রে মানবিক পরিবার গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ সন্তানদেরকে পরিবারেই বিশেষত মাতা-পিতার কাছে মানবতার শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; সন্তানের সম্মুখে স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স, নির্যাতন-নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার ও নীতিনির্ধারকগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি- আমাদের পারিবারিক আইনগুলোকে নিরপেক্ষ ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিতে ঢেলে সাজানোর জন্যে।

আমার নিজের ব্যক্তিগত অধ্যয়নে আমি যতটুকু উপলব্ধি করেছি, তাতে এ ব্যাপারে আমি উপসংহারে এসেছি যে- পরিবারে শৃঙ্খলা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু-কিশোর বয়সে সঠিক শিক্ষা না দিয়ে যত উন্নয়ন, যত নির্মাণ, যত চমক, যত আইন-বিচার ও ফাঁসি কার্যকর করা হোক না কেন- সমাজে ও জাতিতে শান্তি আসবে না, আসতে পারে না। তাই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে সুশৃঙ্খল-সুন্দর পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌলিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করার প্রতি। যে বিষয়ে বিস্তারিত বলেছি, আমার প্রণয়নকৃত এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেলে।

আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতেও রয়েছে অনেক ভুল, যা আমি বাংলাদেশ ও বিশ্ব অধ্যয়ন বইয়ে এবং এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেলে ব্যাখ্যা করেছি। সন্তানদের সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সঠিক শিক্ষা পেলে কোনো সন্তানই ভুল পথে যেতে পারে না। জীবন শুরুর স্কুল-শিক্ষার ও পারিবারিক দীক্ষার মূল ভিতকে তথা নিচতলাকে দুর্বল রেখে উপরতলাকে ইস্পাত-মজবুত করলেও স্থায়ী প্রতিকার হবে না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের সকল শিক্ষার ও জীবন পরিচালনার প্রথম ও মৌলিক ভিত হচ্ছে পারিবারিক পাঠ। এভাবে এখনো সময় থাকতেই আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে সৌন্দর্যের কাছে, পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধগুলোর কাছে। সন্তানদেরকে দিতে হবে অনন্ত সৌন্দর্যময় জগতের সন্ধান; দেখাতে হবে আদর্শ ও আনন্দের জগৎ, নিয়ে যেতে হবে আনন্দলোকে, শেখাতে হবে পারিবারিক ভালোবাসা, দেশপ্রেম, সৌন্দর্য, ভালোবাসার মাধুর্য ও ত্যাগের আনন্দ। তবেই তারা হবে পরিপূর্ণ মানুষ। দেশ যাদের নিয়ে গর্ব করবে এবং যারা গর্ব করবে দেশ ও জাতিকে নিয়ে। যেখানে ধর্ষণ ও খুনের কোনো কল্পনাও নেই।

পরিবারে-সমাজে সেই চর্চা না করে আমরা পিতা-মাতাই যদি একান্ত আবেগ-আনন্দে বিভোর থেকে সন্তানকে যথেচ্ছায় ঠেলে দেই, কোনো কৈফিয়ৎ-কারণ কিংবা আলাপ-আলোচনা ছাড়াই বেপরোয়াভাবে পরিবার-সন্ত্রাসী হয়ে যাই এবং আপন সন্তানের চোখের ওপর একে অন্যকে ডিভোর্স দিয়ে দেই, তাহলে নিশ্চিত ভাঙনের শিকার সেই সন্তান আমাদের কাছ থেকে শিখলো কি, পেলো কি? নিরাপদ-নির্বিঘ্নে পরিবারে ঘটে যাওয়া এসব স্বেচ্ছা অপরাধ থেকে তথা পরিবার থেকেই সে কি সন্ত্রাস, খুন, উচ্ছৃঙ্খলা, ধর্ষণ ইত্যাকার অপরাধের ইন্ধন কিংবা দীক্ষা পায়নি?

সময় ক্ষেপণে কিংবা মূল সমস্যাকে পাশ কাটানোর একবিন্দুও শৈথিল্য কিংবা ফাঁকিবাজি যদি আমাদের কার্যে-মননে ও চরিত্রে পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই অপরাধের জন্য প্রকৃতি আমাদেরকে ক্ষমা করবে না বলে আমার নিগুঢ়তম বিশ্বাস। তাই আসুন, আমরা খুন ও ধর্ষণের নেপথ্য কারণ ও ইন্ধন নিয়ে এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে আরো কিছু আলোচনা-পর্যালোচনা করি। কারণ একটা মন্তব্য চালিয়ে দেয়া খুবই সহজ; কিন্তু বিচার করতে গেলে, সঠিকতায় পৌঁছতে গেলে ব্যাপক স্টাডি করতে হয়; পুনঃপুন অনুসন্ধান, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতে হয়।

গ্রামীণ প্রবাদে আছে- ‘কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হয়’। সেইরূপ খুন ও ধর্ষণের মতো চরম অপরাধকর্ম একদিনে সংঘটিত হয় না এবং একদিনেই যে কেউ খুনী ও ধর্ষক হয়ে যায় না। পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন কু-অভ্যাস, অনাচার ও কুশিক্ষা তাকে ধীরে ধীরে আজকের খুনী ও ধর্ষক পরিচয়ে নিয়ে আসে। তাই তার আজকের এই ১টি অপরাধে যদি তাকে ফাঁসি দিয়ে তার মধ্যে থাকা ৯৯টি গুণকেও মেরে ফেলতেই হয়, তাহলে তার মধ্যে জন্মানো এই একটি অপরাধের সংশ্লিষ্ট সবাইকেও লঘু শাস্তি কিংবা নিদেনপক্ষে তিরষ্কারের ব্যবস্থা করা জরুরি, যা বিশেষ সহায়ক হবে খুন ও ধর্ষণজনিত চরম অপরাধের সমূল নির্মূলে।

সম্প্রতি বরগুনায় স্বামী রিফাতকে হত্যার দায়ে স্ত্রী মিন্নিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, সেই রায়ে মাননীয় বিচারক বলেছেন- এই মামলার ভিকটিম রিফাত শরীফকে খুন করার দায়ে আসামিরা সমানভাবে দায়ী। রায়ে বলা হয়, আসামি মিন্নি এ মামলার ঘটনার পরিকল্পনার মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ড। তার কারণেই হতভাগ্য রিফাত শরীফ নির্মমভাবে খুন হয়েছেন এবং তার মা-বাবা পুত্রহারা হয়েছেন। মিন্নির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তার পথ অনুসরণে তার বয়সী মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই মামলায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। মাননীয় বিচারক যথার্থই বলেছেন, কারণ এরূপ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা রায়ে অনুরূপ কারণ বা ব্যাখ্যা তুলে ধরে আগামীর অন্যায়কে ও অপরাধীদেরকে হুঁশিয়ারি করা জরুরি ছিল।

যতটুকু আমি বুঝতে পেরেছি- এ নারী নয়ন বন্ড এর সাথে প্রেম-পিরিতি খেলে তারপর রিফাতকে বিয়ে করে। তার সাথে দাম্পত্যে থেকে বন্ডের সাথেও পরকীয়া সম্পর্ক বজায় রেখে বন্ড গংকে দিয়ে নিরীহ ও গোবেচারা স্বামী রিফাত হত্যার উৎসবে মেতে ওঠে। পত্রিকান্তরে ছাপানো ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, মিন্নির উপস্থিতিতে বন্ড গং দিনেদুপুরে উন্মুক্ত স্থানে তারই স্বামী রিফাতকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। স্বামীকে খুন করে মেরে ফেলার পূর্ব থেকেই সে স্বামীর সাথে কতগুলো অন্যায় করে আসছে? কতগুলো অপরাধ করেছে সমাজের সাথে, জাতির কাছে? অথচ এই কল্যাণকামী বিজ্ঞ বিচারক ছাড়া অন্য বিচারক যদি এ ব্যভিচারী-কলঙ্কিনীকে কেবল ‘নারী’ ভেবে বিচারের রায়ে নমনীয় হয়ে যেতেন, তাহলে সেই রায়ে জনগণ এত স্বস্তি পেত না। তাই বিচার করতে হবে অপরাধের, নারীর কিংবা পুরুষের নয়। এমনকি আইন প্রণয়ন ও শাস্তির বিধান তৈরি করতে হবে অপরাধরোধে এবং তা কিছুতেই নারী-পুরুষ বিবেচনায় নয়।

অপরাধের ক্ষেত্রে নারীকে লাই দেয়া এবং আইনি সুবিধা দেয়ার ফলে কিছু উচ্ছৃঙ্খল কুচক্রিণী নারী সেই আইনের কীরূপ অপব্যবহার করে যাচ্ছে, তা নারী নির্যাতন আদালতে মামলা চালানো আইনজ্ঞদের সাথে খোলামেলা আলাপ করলে কিংবা ঐসব কোর্ট-রিপোর্টারদের সাথে কথা বললেই বুঝা যায়। এরূপ বিশেষ আইন কুচক্রী নারীদের অপব্যবহারে-অপব্যাখ্যায় ও হুমকি-ধমকিতে পড়ে নিষ্পেষিত ও সর্বহারা হয়ে পথে বসে গিয়েছে কত যুবজীবন ও কত পুরুষের সংসার। নির্যাতিত ও নিঃস্ব হয়ে বুকে প্লাকার্ড লাগিয়ে কত যুবক-পুরুষ আদালত চত্বরে ঘুরছে- আমাকে রক্ষা করুন! আমাকে বাঁচান!! কোনো কোনো নারী নিজের আগ্রহে কিংবা নিজ সম্মতিতে পুরুষের সঙ্গে শারিরীক সম্পর্ক করেও পরবর্তীতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্ষণ মামলা করে দেয়। বর্তমানে চলমান কিছু মামলা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়- কিছু কিছু শারিরীক সম্পর্ক মূলত উভয়ের সম্মতিতেই হয়ে থাকে। পরে মতানৈক্য ঘটলেই পুরুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং এজাহারে সরাসরি ধর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে সাদাসিধা গোবেচারা পুরুষরা কুচক্রী নারীদের ছলনা ও প্রতারণার জালে আটকা পড়ে যান।

নিজ সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরবর্তীতে ধর্ষণ মামলা করার কথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। তদুপরি অন্য কারণেও এরূপ পক্ষমূলক আইনের সুবিধা নেয়ার নজিরও আছে। খুবই স্পর্শকাতর-হইচই পড়ে যাওয়া একটি ঘটনা বলছি, ৮ অক্টোবর ২০২০ তারিখে দায়িত্বরত অবস্থায় বিজিবি’র এক সদস্য চেকপোস্টে এনজিও’র এক মহিলা কর্মীকে তল্লাশী করেন। সেই ঘটনায় বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলে ঐ নারী। যদিও পরে বিজিবি’র পক্ষ থেকে মানহানির মামলা করা হয়েছে। তবে মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে- এরূপ কিংবা অন্য বিভিন্নরূপভাবে নারী নির্যাতন আইন ও মামলার অবারিত অপব্যবহার করছে কিছু নারী এবং সহজ-সরল পুরুষরা হয়রানী ও প্রতারণায় পড়ছেন। কেউ কেউ কমবেশি ভোগান্তি শেষে এরূপ ঝামেলা থেকে মুক্তি পেলেও অনেক পুরুষই আটকে যাচ্ছেন ঘোর গ্যাড়াকলে। এতে অনেক সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ক্যারিয়ার নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।

কেবলমাত্র পুরুষের আগ্রহেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের আগ্রহের কারণেও কোনো কোনো পুরুষ বাধ্য হয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়। পরবর্তীতে পান থেকে চুন খসলেই মামলার ভয়-ভীতি দেখানো হয়। এমনকি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন হয়েছে বলে ভয়াবহ মামলাও ঠুকে দেয়া হয়। অনেক প্রেমিকা মোটা অংকের টাকা দাবি করে প্রেমিকের কাছে। তাছাড়া প্রেমিক-প্রেমিকা পরিকল্পনা করে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বিয়ে করলেও অনেক সময় দেখা যায়, মেয়ের অভিভাবকরা ধর্ষণ মামলা কিংবা অপহরণের মামলা করে থাকেন। দৈনিক কালের কন্ঠে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি’র সমন্বয়ক বিলকিস বেগম বলেন, ঢামেকে অনেক মিথ্যা কেস আসে। মিথ্যা মামলাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি সম্পর্ক সংশ্লিষ্টে প্রতারণার উদ্দেশ্যে করা হয়। অনেক সময় দু’জন বিয়ে করলে মেয়ের মা-বাবা ছেলেকে ফাঁসানোর জন্যও মামলা করেন। এক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলা কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সম্প্রতি পুরুষ নির্যাতন নিয়ে দেশের খ্যাতিমান অনেক কলামিস্ট পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখি করছেন। তাঁদের মতে- পুরুষকে প্রবঞ্চিত করার একমাত্র টার্গেট নিয়েই কতিপয় নারী প্রেমের নামে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। প্রেমিকের সরলতার সুযোগ নিয়ে এক পর্যায়ে তার ওপর অসহনীয় মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। একদিকে ক্যারিয়ার, অন্যদিকে পরিবার, অপরদিকে ছলনাময়ী সেই নারী। দিন দিন পাহাড়সম কষ্ট নিয়ে মৃত্যুর মুখে এগোতে থাকেন নিপীড়িত সেই পুরুষটি। উপায়ান্তর না পেয়ে অনেকে শেষতক আত্মহননের পথ বেছে নেন। এরূপ অজস্র ঘটনা ঘটছে এখন হরহামেশাই। মাস শেষে বেতন পেয়ে পরিবার নিয়ে যেই ছেলেটি সুখে-শান্তিতে দিন অতিবাহিত করতেন। প্রেম-সাগরে ডুবে সেই ছেলেটি এখন মাসের ক্রান্তিলগ্নে ধার করে চলতে হয়। দামি রেস্টুরেন্টে খাবার-দাবার, নামকরা জুয়েলার্স থেকে গহনা কিনে দেয়ার পরও প্রেমিকার মন না পেয়ে সেই ছেলেটি নিদারুণ কষ্টের মুখে পতিত হন দিনকেদিন।

নিজের চাহিদা মিটে গেলে অথবা অন্য কোনো পুরুষের সংস্পর্শ পেয়ে প্রেমিকা বিশ্বাসঘাতকের মতো আচরণ করতে শুরু করে। প্রেমকে পবিত্র মনে করে নিবিড় ভালোবাসা দেয়া সেই প্রেমিককে এক পর্যায়ে নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সুবিধাজনক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের মামলায়ও ফেঁসে যান অনেকে। মেয়েদের এই প্রতারণাকে অনেক বিশিষ্ট লেখক ‘পুরুষ ধর্ষণ’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তাই ধর্ষণ সাজানো মামলার হোতাদের কঠিনতম শাস্তির বিধান থাকতে হবে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের প্রতি সহমর্মিতা থাকা উচ্চমানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। তাছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকারও প্রয়োজন। কিন্তু পুরুষের তুলনায় নারীর জন্যে বেশি অধিকার এবং পুরুষ অধিকারের প্রতি উদাসীনতা মানে বিপথগামী, ধুরন্ধর নারীর অত্যাচার-অবিচার-নৃশংসতায় প্রণোদনা ও ইন্ধন যোগানো এবং প্রকারান্তরে সেই নারীদেরই এমনকি সমাজের সকল বাবা-ভাই-স্বামী-পুত্র সন্তানের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ, অস্থিরতা ও হুমকির দিকে ঠেলে দেয়া; পরিবারে-সমাজে-জাতিতে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা ও অশান্তির বীজ বপণ করে দেয়া।

এই যে দেখুন, উপরোক্ত অপ্রীতিকর বিষয় নিয়ে আমি যে এ লেখা লিখছি, তাও ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আমার এ সহজ-সরল লেখাও স্বার্থান্ধ কারুর সুবিধাভোগে অসুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং তিনি ইচ্ছে করলেই আমার লেখা কোর্টে দেখিয়ে আমাকে শায়েস্তায় পাঠিয়ে দিতে পারে। অথচ এ বিষয়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ কিংবা সুবিধা নেই। আমি এ ঝুঁকি নিয়েছি মানবতার মুক্তির জন্যে, সত্যের অনুসন্ধানে ও সুন্দরের চর্চায়। তাই আমার লেখার কোনো বিষয়ে কেউ দ্বিমত করতে পারেন এবং আরেকটি লিখায় সে দ্বিমতের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু মানহানি হয়েছে বলে নালিশ দিয়েই আমাকে বন্দী করে ফেলার আইন ও নিয়ম থাকার কারণে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সত্যের অনুসন্ধান উদারতান্ত্রিক হচ্ছে না এবং লেখকগণ ভীষণ ঝুঁকির মধ্যে থেকে যাচ্ছেন; আর মানব মুক্তির তৃষিত চাতক হয়ে পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছেন। অথচ লেখক-গবেষক-সাংবাদিকরা কাজ করেন আপাতঃ সত্যের পেছনের মূল সত্য বের করতে; প্রকৃত সুন্দরের চর্চায় সমাজ-দেশ ও জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে।

কোনো নারী যেকোনো যুবক বা পুরুষের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করার সাথে সাথেই পুলিশ তাকে আটক করতে পারার ধারাসহ বিভিন্ন আইনি সুবিধা যেমনি কুচক্রী নারীদেরকে ব্যভিচার-উৎসবে আন্দোলিত করছে, তেমনি এরূপ অন্য বহু নারীর ভাই-ছেলে-স্বামী আজ পথে বসে যাচ্ছে। তদন্ত ছাড়াই হাজতবাস ও শাস্তির ভয়ে বহু পুরুষ স্ত্রীর কাছে বন্দী জীবন ও স্ত্রীর অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। আমার জানামতে এরূপ এক উচ্চশিক্ষিত ক্ষমতাবান নারীর স্বামী নির্যাতনের কিছু বাস্তব ঘটনা এখানে তুলে ধরছি ছদ্মনামে।

বর্তমান সমাজে সাকিব নামের ছোট্ট এক শিশুর বাবা প্রতারক স্ত্রীর কুমন্ত্রণা, অহংকার, হিংসা-ঈর্ষার ঔদ্ধত্যে দীর্ঘদিন ধুকে ধুকে জ্বলে জ্বলে অবশেষে এ অবোধ শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে তার কাছ থেকেও সরে যেতে বাধ্য হয়ে শেষতক শেষ হয়ে গেছে আত্মহননে। কারণ উপরোক্তরূপ নারীদের চেয়েও এ নারীর চরিত্র অধিক ভয়াবহ ও বিপদজনক। ফলে তার পেটের এ শিশুপুত্রও তার ব্যভিচারের অভিশাপমুক্ত নয়। সাকিবের বাবার জীবনালেখ্য হতে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই কর্মযোগীর কঠিন সাধনায় এবং সত্য ও সুন্দরের নিরন্তর চর্চায় বড় হওয়া বিশুদ্ধ মননের নিষ্পাপ এ মানুষটি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কয়েক বছর পর প্ররোচিত হন দূষিত এ নারীর দ্বারা; যার কিশোরী বয়সেই প্রথম বিবাহে তার স্বৈরিণী স্বভাবে বেসামাল হয়ে উঠে।

একদিকে মানসিক ও শারীরিক মেলামেশার সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুদীর্ঘ দিনের বন্ধন থেকে বিদায়ের কিংবা অনুমতির কোনো তোয়াক্কা নেই, অন্যদিকে সামান্য ফোনালাপের পরিচয়েই ঠিকানা নিয়ে এক সকালে বিনা-নোটিশে চলে যায় বর্তমান সাকিবের বাবার ঐ সময়ের ব্যাচেলর বাসায়। শাড়ি-টিপ পরা আচমকা আগুন্তুক সেই অতিথি তার দেহ-সৌষ্ঠবের প্রলোভনে ফেলে দেয় সরলমনা যুবকটিকে; কুমন্ত্রণার সবকিছু করে নিমিষেই বাজিমাত করে ফেলে। এভাবে অল্প ক’দিনের যাতায়াতের মধ্যেই গোপন বিয়ের জন্য ক্রেইজি চাপ দিতে থাকে এবং তারপর জরুরি বাচ্চা নিতে যা যা করার তাই তাই করে। এসবই করেছে সে তার অতীত কলঙ্ক চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে। এভাবে সম্পর্ক শুরু করা দূষিত স্ত্রীর ব্যভিচারে পড়ে শেষ হয়ে গেছে সাকিবের বাবার বিপুল সম্ভাবনাময় শখ-সাধনার ও জ্ঞান-গরিমার আলোকিত জীবন।

স্ত্রীর আশ্চর্য অনাচারে ঘুরপাক খেয়ে হারিয়ে ফেলে নিজ জীবনের সাধ। তাই স্ত্রীর নির্মম অত্যাচার ও শত্রুতার গভীর অমানিশায় পড়ে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৃথিবী থেকে তার বিদায়বাণীরূপে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুাঁশিয়ারিস্বরূপ লিখে রাখেন দু’টি বই। অপ্রকাশিত সেই গ্রন্থ- ‘নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়ার প্রতিফল ও সকরুণ কাহিনী’ এবং ‘ড. স্ত্রীর স্বামী-নির্যাতন’ এর পান্ডুলিপির বিভিন্ন জায়গায় তার নিজ জবানীতে এরূপ বলেন-

“যার কাছে যা আছে, সেতো তাই দিবে অন্যজনকে। আমার কাছে তার জন্য সরল ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা, উৎসর্গ, ধৈর্য-সহ্য-কৃতজ্ঞতা-ক্ষমা যা ছিল তাই দিয়েছি তাকে; সর্বোচ্চ ও সর্বতো সহযোগিতা দিয়েছি আমার পাণিপ্রার্থী এ নারীকে। আর স্ত্রীর কাছে যা ছিল অধৈর্য-অসহিষ্ণুতা, অহংকার-ঔদ্ধত্য, অকৃতজ্ঞতা, নির্মম নিষ্ঠুরতা, প্রতিশোধ, পাশবিক বৈরিতা-শত্রুতা.. তাইতো সে দিয়েছে আমাকে এবং তার সাথে সম্পর্কে জড়ানো সব পুরুষকেও তাই দিয়েছে, দিচ্ছে ও দিতে থাকবে সকল সম্পর্কের শেষ প্রান্তে এসে। এগুলোই তার ব্যক্তি-চরিত্র বলে এর চেয়ে বেশি কিছু কিংবা অন্য কিছু দেবে সে কোথা থেকে! তবে পুরুষের সাথে এরূপ সম্পর্কের শুরুতে শয়তানের প্রতিরূপে মিষ্টি-মধুর মুখের কথা, মনলোভা ছলাকলা, হৃদয়হরী গানের গলা, মন কাড়া চোখের ভাষা এবং শর্টড্রেসে দেহ-সৌষ্ঠবের আকর্ষণ করাতো তার চরিত্রে থাকবেই। এরূপ ছলাকলা না থাকলেতো সম্পর্কের খেলাখেলি শুরুই হবে না। তাছাড়া এসব ঝকমক দিয়ে সম্পর্ককে অনেক উচ্চতায় না তুললেতো শেষ পরিণতিকালে অর্থাৎ নিজ স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে সঙ্গীকে আচমকা ধাক্কায় গভীর তলায় ফেলে জনম ঝাঁকুনি দেয়া যাবে না!

বইয়ের জ্ঞান, বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি -এসবে এদের অহংকার আর গৌরব বাড়ায় এবং ডিগ্রি যত বড় ও উচ্চতর হয়, ক্ষমতার অহংকার আর লাম্পট্যের দাপট তত বাড়ে। কিন্তু এদের প্রকৃত মান-হুঁশ হবার যে দীক্ষা কিংবা মানবিক গুণাবলীর একাডেমিক শিক্ষা, তা কখনোই তাদের কিশোরী বয়সের অসৎ চরিত্রের বুহ্য ভেদ করতে পারে না। অর্থাৎ শিক্ষা-দীক্ষা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম এদের কুচরিত্রে পরিবর্তন আনতে পারে না; কিছুতেই হনন করতে পারে না এদের অন্ধ-আত্মকেন্দ্রিকতা, লোভ-লালসা, অহং ও অমনুষ্যচিত স্বার্থপরতা। এদের জন্য একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে-

ইল্লত যায় না ধুইলে
খাসলত যায় না মইলে”

আরেক পান্ডুলিপিতে সাকিবের বাবা আরো লিখেন- “তার কাছে আমার স-ব হারিয়ে এখন সর্বহারা নিঃস্ব হয়ে এক বিশাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পেয়েছি। যেই জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের এত ডিগ্রিতে কিংবা সুবিশাল লাইব্রেরির পড়ায়ও পাইনি। এ নারী-দুশ্চরিত্রের বিশাল ক্যানভাস থেকে যা পেয়েছি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এবং সে প্রেক্ষাপটে নিবিড় অনুসন্ধান, নিরন্তর গবেষণা ও স্রষ্টার সত্য চর্চায় আমি এখন ঢের সমৃদ্ধ; যা পরকালের-পরজনমের সুবিশাল সঞ্চয়ন, আলহামদুলিল্লাহ। তাই এখন আমি আনন্দিত যে, আমার যুব-বয়সের এরূপ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে স্রষ্টা আমাকে এ নষ্ট মেয়ের ফাঁদে ফেলে শেষতক দিয়েছেন অমিয় স্বাদের সু-বি-শা-ল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। যেরূপ অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন বহু মনীষী, বিজ্ঞানী তাঁদের স্ত্রীর চরিত্র পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে। অনুরূপভাবে এ দূষিত নারীর চরিত্ররূপ এখন আমার জন্য এক মহান শিক্ষা ও গবেষণা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত দিকনির্দেশনা। তাই আমি এখন আমার আত্মসমালোচনা ও আত্মঅনুসন্ধান করে বলছি, তার কোনো ভুল হয়নি; ভুল করেছি শুধু আমি।

হ্যাঁ, আমি অকপটে স্বীকার করছি আমার ভুল। আমার প্রতি এ নারীর স-ব নিষ্ঠুর নির্যাতনের জন্য দায়ী আমি; দায়ী আমার সরল বিশ্বাস আর অন্ধ ভালোবাসা। আমি এখন বুঝতে পেরেছি- সব নারী মাতৃতুল্য নন, সব নারী বিবি খাদিজা নন, সব নারী মাদার তেরেসা কিংবা শেখ ফজিলাতুন্নেছা কিংবা ফয়েজুন্নেছা নন। আমি স্বীকার করছি- এই অযোগ্য মেয়েকে এতবেশি সম্মান দিয়ে প্রেরণা যুগিয়ে তাকে উন্নতির শিখর চূড়ায় তোলা ছিল আমারই ভুল, আমার জন্মের ও জন্মান্তরের অন্যতম সুবিশাল ভুল। তাইতো আমার এ ভুলের জন্য আমি ছোট্ট শিশু সাকিব, রাকিবসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ সবার কাছেই ক্ষমা চাচ্ছি।

কিশোরী-তরুণী বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের হলে-হোস্টেলে, ব্যাচেলর কোয়ার্টারে এবং যুবালয়ে গিয়ে গিয়ে তার চরিত্র হারানোর কথা তারই মুখে জেনে-শুনেও আমাকে বিয়ে করার জন্য তার ক্রেইজি আহ্বানে রাজি হয়ে যাওয়া ছিল আমার প্রথম ভুল। তদুপরি তার এহেন অতীত চরিত্রের ধরণ বিবেচনায় না এনে তাকে পাশ্চাত্যের উন্মুক্ত-স্বাধীন অঙ্গনে নারী-শিক্ষায় দীক্ষিত করার সকল আয়োজন এবং আমার সরল মনের সুবিশাল পরিকল্পনা করা ছিল দ্বিতীয় বড্ড ভুল। তার বোন-দুলাভাইয়ের নিষেধ সত্ত্বেও তাকে বিলেতে পড়তে সব আয়োজন করে দেয়াতো ছিল আমারই চরম বোকামি-ভুল। কোলের শিশু-কন্যাকে আমার কাছে রেখে তার মাকে বিলেতের মুক্ত মেলামেশার সমাজে পাঠানো এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে তুলে দিতে গিয়েও তার ব্যক্তি-স্বাধীনতার পথ শানিত করতে তাকে যে বলে দিয়েছিলাম, Don’t hesitate to enjoy aûthing around your World -সেসবতো একমাত্র আমারই ভুল।

পুনরায় দুই শিশু ছেলে ও মেয়েকে একত্রে আমার কাঁধে নিয়ে তাদের মাকে পিএইচডি করতে দীর্ঘদিনের জন্য হল্যান্ড পাঠানো এবং তৎপরবর্তীতে মিডিয়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে মধ্যরাত অবধি টকশোতে অনুমতি দিয়ে অবারিত ক্ষমতাবান করা এবং তার মধ্যে অহংকারের পাহাড় তৈরির সুযোগ করে দেয়াতো ছিল আমারই ভুল। এসবই যে আমার ভুল, আমার চরম ব্যর্থ প্রয়াস; এসবই যে আমার নিজের পায়ে কুঠারাঘাত...; তা এখন তার উন্মাদ চপেটাঘাতের পরে আমি একাকী নির্জন-নিরালায় বসে আল-কোরআন পড়ে এবং স্বর্গ থেকে পৃথিবী তৈরি ও বিধ্বংসের কাহিনীসমগ্র বিশেষত সাম্প্রতিক কভিড-১৯ বা করোনা গ্রাস দেখে সুনিশ্চিত হচ্ছি।

যতই পড়ছি, ততই শিখছি; আর বুঝতে পারছি কিশোরী বয়সে চরিত্রহীন বিকৃত রুচির স্ত্রীর ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অন্ধ-পাগলামি করা আমার ক-ত ব-ড় ভুল! তাই এ ভুলের জন্যইতো আমি কঠিন চপেটাঘাতে শাস্তি পেয়েছি স্বয়ং এ বিশ্বাসঘাতক স্ত্রীর কাছ থেকে এবং এখনো আছি তার নষ্ট চরিত্রের নিষ্ঠুর নির্যাতন ও শত্রুতার প্রলয়ে। এখন শুধু ক্ষমা চাইছি আমার ছোট্ট ছেলে সাকিবের কাছে- শিশু বয়সেই যে পড়েছে মায়ের বহুমুখী প্রবঞ্চনায় এবং বাবা-ছেলের সুসম্পর্কের প্রতি তার মা’র ঈর্ষায়। যা আমার আরেক নতুন ট্র্যাজিক এক্সপেরিয়েন্স; তাই আমি পাহাড়সম ভার বুকে বয়ে, আর সাগরসম অশ্রুজলে এ শিশুর সাথে যোগাযোগ থেকেও নিজকে বিচ্ছিন্ন করার কঠিন প্রয়াস নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছি না। বিষাক্ত ব্যভিচারিণীর কাছে আমার পরাজয়কে বরণ করে হলেও একটি শিশুকে তার মা’র ঈর্ষামুক্ত, অত্যাচার-অবিচারমুক্ত রাখাই এখন এ অসময়ের অতীব জরুরি কাজ। তাহলে এমনওতো হতে পারে আমার এরূপ উৎসর্গীকৃত এ শিশু-সন্তানই দেশ ও জাতির সূর্য-সন্তান হিসেবে আগামীর পুরুষ-নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজে রাখতে পারে বিশাল ভূমিকা। এতদিনে আমার বোধোদয় হয়েছে যে-

স্বার্থপর মানুষরাই জীবনে ভালো থাকে;
আর বোকারাতো কেবল অন্যকে ভালো রাখে॥

হে দয়াময়, আপনি আমার ওপর এ নারীর আরও কঠিন নির্যাতন দিয়ে হলেও এই নিষ্পাপ-অবোধ শিশুটিকে রহমত আর বরকতে ভরিয়ে দিন; আর আমাকে এ বিপথগামী কুচক্রিণীর ব্যভিচার-নির্যাতন সইবার তৌফিক দিন।  উপকার করে বাঁশ খাওয়া বোকা মানুষগুলোর জন্যইতো পৃথিবী এতো সুন্দর। তাই হে আল্লাহ, আপনি আমার এ বোকার প্রার্থনা কবুল করুন, সবাইকে মাফ করুন; যদিও জানি যে- ইবলিশরূপী এরূপ মানুষকে আপনি হেদায়েত দান করেন না। তবুও আমার ৩ অবুঝ সন্তান বিশেষত নিষ্পাপ শিশু-সাকিবের কথা বিবেচনা করে আপনি তাদের এ বিপথগামী মাকে হেদায়েত করুন -আমিন।”

এভাবেই সাকিবের লেখক বাবা তুলে ধরলেন এ বাংলার ইবলিশ এক ললনাকে তার উক্ত দু’বইয়ে। ভুক্তভোগী স্বামীর সরাসরি নিজের লেখা পান্ডুলিপিতে আরো বহু বাস্তব তথ্য-উপাত্ত, উদাহরণ, ডক্যুমেন্ট দেয়া হয়েছে; যা পড়লে কিংবা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলে কোনো কোনো চ্যাপ্টারে সহৃদয় যেকোনো পাঠককে এক প্রতিবাদমুখর ট্র্যাজিক বেদনায় পড়তে হতে পারে। নারী অধিকার ও নারী স্বাধীনতা নিয়ে যে আমি বহু লেখালেখি করেছি, নিজ প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ও কার্যক্রমে বহু আন্দোলন করেছি; সেই আমি এখন উপরোক্তরূপ বিভিন্ন ব্যভিচারী নারীর বীভৎস রূপে স্তম্ভিত ও লজ্জিত।

ঐ পান্ডুলিপিতে লেখক ভয়ঙ্কর স্ত্রীর বীভৎস চরিত্রের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পাশাপাশি তার বন্ধু-দম্পতির উপাখ্যান এবং প্রোএকটিভ এটিচিউডের মহিয়সী-গরিয়সী এক নারীর গঠনমূলক চিন্তা ও চরিত্রের কথাও লিখেছেন এভাবে- স্বামীর পাশ থেকে উঠে স্ত্রী প্রতিরাতে কোথায় যেন যায়। এতরাতে কী এমন কাজ থাকতে পারে যে, সে প্রতিরাতে চলে যায়। স্বামীর মনে চিন্তা ঢুকে গেলো- কী করে সে? তার কী কোনো অবৈধ সম্পর্ক আছে? সেতো ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। তার দ্বারা কী কোনো বাজে কাজ সম্ভব?

আবার সে এও চিন্তা করে, সে কী ভালো মানুষের মুখোশ পরে আছে? অনেক চিন্তা-ভাবনার পরে সে ঠিক করলো- আজকে যেভাবেই হোক সে দেখবে, তার বউ কী করে? দিন শেষ, রাত এলো। এবার অপেক্ষার পালা। কিছুক্ষণ পর সে টের পেল, তার স্ত্রী বের হয়ে যাচ্ছে। সে আর দেরি না করে স্ত্রীর পেছন পেছন যাওয়া শুরু করলো। স্ত্রী প্রথমে তাদের নলকূপের কাছে গিয়ে কী যেন করছে; স্বামী গাছের আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখছে। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী তাদের পাশের রুমে গিয়ে দরজাটা আটকিয়ে দিলো। রুম অন্ধকার, কোনো সাড়াশব্দ নাই। স্বামীর মনে সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। সে আরো ভালোভাবে দরজার সাথে কান লাগিয়ে রাখলো। কিছুক্ষণ পর সে কান্নার শব্দ শুনতে পেল। তার স্ত্রী কী যেন বলছিল; কান্নার কারণে সে বুঝতে পারছিল না।

আর একটু সময় যখন পার হলো তখন কান্নাটা একটু কমলো, স্বামী শুনতে পেলো তার স্ত্রী কী বলছে। স্ত্রীর কথাগুলো ছিল এমন- হে আমাদের পালনকর্তা; তোমার কাছে একটাই চাওয়া আমার; তুমি আমার স্বামীকে মুত্তাকী, পরহেজগার ও নামাজী বানিয়ে দাও। আর তুমি আমাকে সৎসন্তান দান করো। যারা আমার স্বামীর দুশমন ও শত্রু তাদের তুমি হেদায়েত দান করো। সকল বিপদআপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করো। জান্নাতে আমাদের একসাথে থাকতে দিও।

স্ত্রীর এরকম কথা শুনে স্বামী আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। তার দু’চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগলো। যাকে সে সন্দেহ করে এসেছে, তার মুখে এরূপ কথা। আর গভীর রাতে লুকিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়ার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে সে তৎক্ষণাৎ তার পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলো এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো- আর কোনো পাপ কাজ সে করবে না। সবসময় আল্লাহর পথে চলবে এবং তার স্ত্রীকে সারাজীবন ভালোবেসে যাবে। কখনো তাকে আর অবিশ্বাস করবে না।

উক্ত গল্পের শিক্ষাঃ একজন নারীই পারে তার স্বামীকে এবং তার সন্তানকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। আবার একজন স্বামীও পারে ধৈর্য্যহারা না হয়ে স্ত্রী-সন্তানকে সঠিক পথে ফেরাতে।
যেসকল নারী প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা ও জিঘাংসা পরায়ণ, তারা সবাই পারে এ মহিয়সী নারীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের স্বামী-সন্তানে, পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।
এবারে আজকের লেখার মূল বিষয় বর্তমান সময়ের সর্বাধিক আলোচিত ও আন্দোলিত নারী ধর্ষণের সাজা ভিনদেশে ও বাংলাদেশে, এ পর্যালোচনায় কিছু কথা লিখে শেষ করছি।
ধর্ষণের সাজাঃ ভিনদেশে ও বাংলাদেশে!
- আমেরিকাঃ ধর্ষিতার বয়স ও ধর্ষণের মাত্রাভেদে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড।
- রাশিয়াঃ ২০ বছর সশ্রম কারাদন্ড।
- চীনঃ কোনো ট্রায়াল নেই, মেডিকেল পরীক্ষার পর মৃত্যুদণ্ড।
- পোল্যান্ডঃ হিংস্র বুনো শুয়োরের খাঁচায় ফেলে মৃত্যুদণ্ড।
- মধ্যপ্রাচ্য আরব দুনিয়াঃ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত পাথর ছুঁড়ে মৃত্যু, ফাঁসি, হাত-পা কাটাসহ অতি দ্রুততার সাথে মৃত্যুদণ্ড দেয়া।
- সৌদি আরবঃ শুক্রবার জুম্মা শেষে জনসম্মক্ষে শিরন্ডেদ।
- দক্ষিণ আফ্রিকাঃ ২০ বছরের কারাদন্ড।
- মঙ্গোলিয়াঃ ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে প্রতিশোধ পূরণ।
- নেদারল্যান্ডঃ ভিন্ন ভিন্ন সাজা।
- আফগানিস্তানঃ ৪ দিনের ভিতর গুলি করে হত্যা।
- মালয়েশিয়াঃ মৃত্যুদণ্ড।
- আর বাংলাদেশে?
বছরের পর বছর তদন্ত প্রক্রিয়ায় ঝুলে থাকা, অন্যায় ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তার, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, অভিযোগ প্রমাণে আইনি জটিলতা ইত্যাদি!

শেষ কথা
একদিকে অতি সহজলভ্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক অপব্যবহারসহ জাতীয় জীবনের বহুক্ষেত্রে নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, অন্যদিকে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইনি দুর্বলতার কারণে বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। নারীর প্রতি সমাজ-সংস্কৃতির চিরায়ত সম্মান সম্ভ্রম মর্যাদা শালীনতার ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ ভেঙে তৈরি হচ্ছে ঘৃণ্য অনৈতিক অমানবিক পৈশাচিকতা। অপরপক্ষে, বিদ্যমান নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহারে পুরুষ হয়রানিসহ নারী স্বাধীনতার নামে যখন-তখন স্ত্রী কর্তৃক স্বামী-ডিভোর্সের সংখ্যাও সমাজে আশংকাজনক হারে বেড়েই চলেছে। ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, বিশৃঙ্খল হচ্ছে সমাজ; উচ্ছৃঙ্খল ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এসব ভাঙা পরিবারের কিংবা পারিবারিক আত্মীয়ের অপ্রকৃতিস্থ অসহায় সন্তান ও তরুণ যুবসমাজ।

যেকোনো মানুষের সুউন্নত মানস গঠনের পেছনে তার পারিবারিক শিক্ষা ও মা-বাবার মূল্যবোধ দীক্ষার কোনোই বিকল্প নেই। অথচ এসব যুবকের সন্মুখে অনুকরণীয় ও আদর্শ চরিত্রের এমনকি সৎ ও নীতিনিষ্ঠ মা-বাবার বড্ড অভাব। তার নিজের জন্মদাতা বাবাকে সমীহ-সম্মান-স্বীকৃতি দিচ্ছে না তারই জন্মদাত্রী মা। মাকে শিক্ষা-দীক্ষায়, ডিগ্রিতে সার্টিফিকেটধারী ও চাকরিতে ক্ষমতাবান বানিয়ে, বাড়ি-গাড়ি করে দেবার পর সেই অহংকারী-স্বার্থান্ধ মা ডিভোর্স দিয়ে তার বাবাকে ঘর-সংসার থেকে রাস্তায় বের করে দিয়ে বাবার কষ্টার্জিত সম্পদ-সংসার-সন্তান স-ব ভোগ করছে একাই। নিজ কোলের শিশুর কিংবা অবোধ সন্তানদের স্বার্থও ভুলুন্ঠিত মা’র কাছে। কোনো সমাজপতি কিংবা কোনো বিচারকের কাছ থেকে সুবিচার না পেয়ে কিংবা আইনি সহায়তা না পেয়ে ধুকে ধুকে সকরুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে তারই জন্মদাতা বাবা। মা’র এহেন নির্মম-নিষ্ঠুর পৈশাচিকতা অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে দেখে সে এখন তার নিজের জন্ম ও ভবিষ্যৎ এবং তার নিজের পারিবারিক জীবন নিয়েই কনফিউজ্ড। মাকে মুখ খুলে বলতে না পারা এমন বহু প্রশ্ন এখন সে বুকে চেপে বেড়াচ্ছে- তাহলে কে আমার প্রকৃত জন্মদাতা পিতা?

এরূপ বহুক্ষেত্রেই তরুণ-যুবকের কাছে নেই কোনো উত্তর, নেই সুবিচার কিংবা পুরুষের উপর নারী-নির্যাতনের নেই বিশেষ আইনি সহায়তা। এ নির্বোধ অসহায় যুবকদের ভবিষ্যৎ কোথায়? তাদের নিজেদের হবু ঘর-সংসারের নিরাপদ-নিশ্চয়তা কোথায়? জন্মাদাতা পিতার ওপর মা’র এরূপ নিষ্ঠুরতা দেখে শিশু-কিশোরের কোমল হৃদয়ও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে নির্মম-নিষ্ঠুর। সে দেখছে সন্তানের সম্মুখেই বাবা পিটাচ্ছে মাকে কিংবা তার সুহৃদ-বন্ধুর পিতা পিটিয়ে জখম করছে স্ত্রীকে। তার সম্মুখে অনুকরণীয় ভালো উদাহরণের চেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাপ্রবাহই বেশি। ২০ কোটি মানুষের মধ্যে ১০ জন আদর্শ ও অনুকরণীয় মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না সে। এরূপ পারিবারিক-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক নেতিবাচক ঘটনাসমূহে পর্যুদস্ত বিবেকের এ যুবকের কাছে ধর্ষণ এখন কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা ঘটনা নয়। তাই সামাজিক অবক্ষয়ের এরূপ চরম ক্রমাবনতিশীল অবস্থায় ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের জন্য স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত এবং বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ডের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যেমনি জরুরি, তেমনি নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার করে সন্তানের মা কর্তৃক সন্তানের সম্মুখে তার বাবার ওপর নির্মম নির্যাতন ও অন্যায় ডিভোর্সসহ যেকোনো মানুষের ওপর অপর মানুষের নির্যাতন, হয়রানি ও অমানবিক আচরণ কিংবা কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার অতীব জরুরি।

কেবল তাহলেই সুস্থতা ও শান্তি বিরাজ করবে পরিবারে-সমাজে-জাতিতে, এমনকি বিশ্বপরিসরেও! আর তা না হলে ফাঁসি দিয়ে কিংবা শিরচ্ছেদ করে কেবল প্রতিশোধই নেয়া হবে এবং তা হয়ত করতেও হবে; এতে ছাড় দেয়াও ঠিক হবে না। কিন্তু অসুস্থ যুব-মস্তিষ্কে মা-বাবার কিংবা সমাজের তৈরি অসুস্থতা ও বিকৃতি রোধ করা বা ধর্ষণবিহীন সুস্থ সমাজ পাওয়া সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। কারণ যুবকের মনোরাজ্যে দানাবাধা উপরোক্তরূপ অপ্রকৃতিস্থতা ঠেকাতে না পারলে তার লক্ষ্যহীন হতাশ জীবনের আত্মাহুতিতে কেবল উৎসাহ ও প্রণোদনাই যোগাবে এরূপ ফাঁসি কিংবা মৃত্যুদণ্ড। এছাড়া কাজের কাজ কিছু হবে না।

ধর্ষণ যেমনি নিকৃষ্টতম অবৈধ কাজ, ডিভোর্সও তেমনি নিকৃষ্টতম বৈধ কাজ। সমস্যা হচ্ছে নিকৃষ্টতম বৈধ এ ডিভোর্সের কাজটিতে এক ব্যক্তির একক খামখেয়ালীর পুরো সুযোগ রাখা হয়েছে। স্ত্রী কিংবা স্বামী যেকোনো একজন তার ব্যক্তিগত একান্ত স্বার্থে কিংবা ফন্দিতে কেবল ‘বনিবনা হয় না’ এরূপ দু’টি ভেগ শব্দ সংবলিত ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে তাতে অনড় থেকে অতিসহজেই বিবাহ-বিচ্ছেদ কার্যকর করে ফেলতে পারে। তার এ খামখেয়ালীতে অপর স্পাউজসহ কত সন্তানের, কত আত্মীয়-স্বজ্জনের জীবন ভাঙ্গলো কিংবা কতগুলো পারিবারিক আত্মীয়তা ধ্বংস হলো -সে ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়ে ডিভোর্সদাতাকে কোনোরূপ বাধাবিপত্তি এমনকি প্রশ্ন করারও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি প্রচলিত আইনে। সেই কারণে পরিবার ভাঙন কবলের অপ্রকৃতিস্থ সন্তানের সংঘটিত খুন-সন্ত্রাস-ধর্ষণসহ নানা অপরাধের শাস্তি দিয়েও এ অপরাধ আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না। কারণ অপরাধের মূলে তথা উৎসস্থলে প্রবেশ করার এবং সেই নেপথ্য অপরাধ-উৎসবে মেতে থাকা বাবা কিংবা মা’র কোনোরূপ জবাবদিহি নেই কারুর কাছেই।

যে সন্তান খুন বা ধর্ষণ করলো, তাকে আমরা ফাঁসি দিয়ে অবশ্যই স্বস্তিতে থাকব এই বলে যে, সুবিচার বা সঠিক বিচার করেছি-দিয়েছি-পেয়েছি। কিন্তু খুনী-সন্ত্রাসী ও ধর্ষকরূপে এই সন্তানকে পরিবারের উগ্র-উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষা-দীক্ষায় যেই বাবা কিংবা মা গড়ে তুললেন, তাঁদেরকে সংশ্লিষ্ট অপরাধ-আইনের আওতায় আনা অধিকতর জরুরি প্রয়োজন এবং তাহলেই অন্যায় ও অপরাধের মূল উৎপাটন এবং অন্যায়-অপরাধের কারখানাগুলো বিনষ্ট করা কিংবা ধ্বংস করে দিয়ে সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমার ব্যক্তিগত ও নিগূঢ়তম বিশ্বাস। তা না করতে পারলে-
আমি দ্বিধান্বিত যে, মিন্নির মতো স্বামী-খুনীর ঘর থেকে সুসন্তান কতটা আশা করা যায়?
পরিবার ভাঙ্গন থেকে গড়ে ওঠা কিংবা পারিবারিক সন্ত্রাস-নির্যাতনের মধ্যে থেকে বেড়ে ওঠা যুবকের কাছ থেকে আমরা যদি স্বস্তি-শান্তি চাই, তাহলে তা আহাম্মকি ব্যাপার নয় কি?
ঐরূপ যুবকের Belief System এ কিংবা চিন্তায় ও মননে পশু-প্রবৃত্তি তথা খুন-ধর্ষণ সাধারণ দৃষ্টিতে নিকৃষ্টতম অবৈধ কাজ হলেও এরূপ পশু-প্রবৃত্তি তার মধ্যে ছোট্টবেলায়ই কিংবা তার শিশুমনে গেঁথে দেবার জন্য তার বাবা-মাকে জবাবদিহির আওতায় অন্ততপক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিচারের মুখোমুখি আনা দরকার নয় কি?
খুনী-ধর্ষণকারীকে ফাঁসি দেয়ার পাশাপাশি খুনী-ধর্ষক তৈরির কারখানাগুলো সংশোধন-সংস্কারে কাজ করা সুসভ্য, শান্তিময়, সুন্দর সমাজ নির্মাণের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয় কি?
ধর্ষণের মতো পশু-আচরণ কিংবা বরগুনায় দিনেদুপুরে স্বামী রিফাতকে তার স্ত্রী মিন্নির ইন্ধনে কুপিয়ে অমনুষ্যচিত হত্যাকা- আমাদেরকে যেই কলি জমানায় নিয়ে যাচ্ছে, এসব নেতিবাচকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা রুখে প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউডের সুস্থ-সুন্দর-সুউন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি তথা প্রোএকটিভ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি এ নগণ্য কর্তৃক প্রায় এক দশক পূর্বে ২টি গবেষণা-মডেল প্রণয়ন করে নিজ অর্থ-ব্যয়ে ছাপিয়ে সেই মডেল-বই রাষ্ট্র ও সরকারের কর্ণধার, মন্ত্রী-সচিব-এমপিসহ প্রায় সকল নীতিনির্ধারকগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছিয়েছি। দু’টি মডেলের একটি হচ্ছে- সুউন্নত শিক্ষার ভিত মজবুত ও সুযোগ্য নাগরিক গড়ে তুলতে এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেল। অন্যটি হচ্ছে- বাংলাদেশের স-ক-ল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অত্যাধুনিক মডেল। যাতে রয়েছে বিশ্বের বুকে প্রোএকটিভ এটিচিউডের সুউন্নত ও শক্তিশালী বাঙালি জাতি গড়ে তোলার সহজ পদ্ধতি; প্রতি ইউনিয়নে পাবলিক মিডিয়া, মোটিভেশন এন্ড ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। যেখানে বিপথগামী মানুষের মনন ও চিন্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনে অর্থাৎ সংশোধন ও সংস্কারের পজিটিভ মগজ ধোলাই করে দেশ-মাতৃকার কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব।

বর্তমান সময়ের অগণিত ধর্ষণ ও সন্ত্রাস ঘটনাবলির সাথে আমার প্রণীত উপরোক্ত দু’টি মডেল অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করলে এ প্রবাদের সত্যতাই পরিস্ফূট হয়ে উঠবে যে- ‘কাঙালের কথা বাসি হলেই ফলে’। তাছাড়া ‘পারিবারিক ও প্রাথমিক শিক্ষাই সকল শিক্ষার ও জীবন পরিচালনার প্রথম ও মৌলিক ভিত’ কাঙালের সে বিশ্বাসেও আরো জোর পাবেন যখন শুনবেন যে, মাদার তেরেসা বলেছেন- বিশ্বশান্তি গড়ে তোলার জন্য তুমি একা কি করতে পার? হ্যা পার ! তুমি আপন গৃহে শান্তি গড়ে তোল। What can you do to promote world peace? Go home and love your family.


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ