বিশেষ খবর

জাতীয় পর্যায়ে দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলি বাড়ানোর উপায়

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

জন্মভূমির জন্য ভালোবাসা তথা দেশপ্রেম আমাদের সকলের মধ্যেই কমবেশি আছে। কিন্তু এ দেশপ্রেমকে সঠিক উপলব্ধি ও কার্যকর ব্যবহার আমাদের অনেকেরই হয়ে ওঠে না। দেশপ্রেম মানে যেমন দেশের প্রয়োজনে যখন-তখন প্রাণ দেয়া, দেশের মঙ্গলে কাজ করা -ঠিক তেমনি দেশকে অমঙ্গলের হাত থেকে রক্ষা করাও দেশপ্রেম। জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে এমন দেশপ্রেম দেখানোর, যার অর্থ হবে দেশকে যেকোনো অশুভ হাত থেকে রক্ষা করা, দেশের ক্ষতির কারণ না হওয়া। আর এ কাজটিও খুব সহজ। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কেবল এ কথাটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি যে- দেশ আমাকে কী দিয়েছে তা ভাবার আগে ভাবতে হবে দেশকে আমি কী দিয়েছি -তাহলে আর বেশি কিছু ভাবনার থাকে না। এ ভাবনার সঠিক উত্তর নিজের ভেতরে সত্যিকার দেশপ্রেম জাগ্রত করতে যথেষ্ট।
ছোটবেলায় একটি কথা আমরা সকলেই হয়তো পড়েছি- পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, মানুষ প্রাণপন চেষ্টায় মানুষ। সৃষ্টির সেরা হিসেবে মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু কেবল দু’হাত-দু’পা নিয়ে জন্ম নিলেই তাকে কি সৃষ্টির সেরা বলা যায়? তাহলে চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসী, খুনী -এরাও কি সৃষ্টির সেরা জীব? মানুষকে সৃষ্টির সেরা হতে হলে প্রয়োজন মানবিক গুণাবলী। আর মানবিক গুণাবলী তৈরি বা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কিছু গুণ ও দর্শনের অবিরাম চর্চা।  আসলে মানব মনে চিন্তার সূত্রপাত তথা চৎরসধৎু নৎধরহ ঢ়ৎড়মৎধসসরহম হয় পরিবারে, এ প্রোগ্রামিংয়ের এডভান্সড লার্নিং হয় শিক্ষায়তনে এবং শেষতক তা বদ্ধমূল হয় তার আশপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচার-আচরণের প্রভাবে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকার কথা আমি বলতে চাচ্ছি।
বর্তমানে যুবসমাজ যেভাবে খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ছে এবং তাদের যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে পরিবারের ভূমিকার পাশাপাশি সমাজেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ছাত্র-যুবকদের গঠনমূলক ও আউটপুট ওরিয়েন্টেড কাজে সম্পৃক্ত রেখে দেশের ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য পাড়ায়-মহল্লায় এমন কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেগুলো ছাত্র-যুবকদের জন্য কাজ করবে।
ছাত্র-যুবকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আত্মোন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, ঐক্যবদ্ধতা, নীতি-নৈতিকতাসহ বিভিন্ন মানবিক গুণাবলি উন্নয়নের প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশনের জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে চালু থাকতে হবে পাবলিক ট্রেনিং এন্ড মিডিয়া সেন্টার। অর্থাৎ জীবনকে যাপনযোগ্য করার যাবতীয় প্রোগ্রামিং বা হিউম্যান ওয়ারিংয়ের প্রয়োজনীয় মানবিক গুণাবলি তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নিয়মিত নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছি জাতীয় সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধান মডেলে (িি.িযবষধষ.হবঃ.নফ/সড়ফবষ)।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দেশোন্নয়নের জন্য সর্বপ্রথম দরকার মানুষের মধ্যে প্রাণের উষ্ণতার অভাব তাড়ানো তথা মানবিক মূল্যবোধের দুর্ভিক্ষ দূর করা। আর এজন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ পারিবারিক ভালোবাসা আন্দোলনে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করা।  পরিবার যেহেতু শিশুর প্রথম শিক্ষালয়, তাই দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলী বৃদ্ধির চর্চা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। এজন্য ছোটবেলা থেকেই শিশুর অনুভূতি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজের ভেতরে অনুভব ও একাগ্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটানো সম্ভব। প্রতিটি পরিবারে এরূপ প্রচেষ্টাই পারে জাতীয় পর্যায়ে দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলী বাড়াতে। এর পাশাপাশি মাইক্রো ও ম্যাক্রো লেভেলে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও তৈরি করে দিতে হবে শিশুবয়স থেকেই। তবেই না পরিণত বয়সে এসবের ফল পাওয়া সম্ভব হবে। সকল ক্ষেত্রে কেবল আমি আমি না করে তথা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে চাতুর্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর নানা ধারণায় আমাদের সন্তানরা এখন ভুগছে মূল্যবোধ সংকটে। আমরা যেমন সন্তানদের সঠিক পথ চেনাতে ব্যর্থ হচ্ছি, তেমনি তারাও ব্যর্থ হচ্ছে জীবন ও জগতের কাঙ্খিত পাঠ নিতে। বঞ্চিত হচ্ছে মমতা ও ভালোবাসার আনন্দ থেকে; মানব সেবার তৃপ্তি ও সুখ থেকে।
আমাদের ফিরে আসতে হবে সৌন্দর্যের কাছে, পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধগুলোর কাছে। সন্তানদেরকে দিতে হবে অনন্ত সৌন্দর্য্যময় জগতের সন্ধান। দেখাতে হবে আনন্দের জগৎ, নিয়ে যেতে হবে আনন্দালোকে; শেখাতে হবে দেশপ্রেম, ভালোবাসার মাধুর্য্য ও ত্যাগের আনন্দ। তবেই তারা হবে পরিপূর্ণ মানুষ। দেশ যাদের নিয়ে গর্ব করবে এবং যারা গর্ব করবে দেশ ও জাতিকে নিয়ে। এরূপ দেশপ্রেম ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানব সম্পদ গড়ে তোলার প্রথম ও প্রধান সোপান পারিবারিক পাঠ। পরিবার হবে জাতীয় ও বিশ্বশান্তির পাদপীঠ। যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রেই পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। দেশপ্রেম ও মানবিক গুণাবলী বৃদ্ধিতে তাই জরুরি প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ।  পরিবেশের প্রভাব আসলে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পরিবেশ থেকে এসে স্কুল, কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে যেভাবে ভারসাম্যময় ও একই মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠে, তার পেছনে পরিবেশের ভূমিকা থাকে। এর একটি উপায় হতে পারে অধ্যয়নমূলক উন্মুক্ত আলোচনা। প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ছাড়াও জীবনের বিভিন্ন দিক বা দর্শন। ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে নিজকে দায়িত্ববান, সৎ, স্বচ্ছ, সফল ও সুউন্নত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পুঙ্খানুপুঙ্খ দিকনির্দেশনা। 
মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও মানবিক গুণাবলী বিকাশে কিছু দর্শন অনুসরণ করলে সফল হওয়া যায়। যেমন- যুক্তিভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক আচার-আচরণ করা; দেনা ও দায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকা; ন্যাচারাল হওয়া তথা সহজ-সরল ও স্বাভাবিক থাকা; ক্ষমাশীল ও ধৈর্যশীল হওয়া; আত্মঅনুসন্ধান ও আত্মোপলব্ধিঃ অন্যায় বা ভুলের জন্য অনুশোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা; ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার চর্চা; সময়, সুযোগ ও স্থানের সদ্ব্যবহার; সততার লালন ও চর্চা; গণতন্ত্রের অনুশীলন এবং অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতনতা; নীতি-আদর্শ ও ধর্মকর্ম পালন। 
এর সাথে আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই। তাহলো অন্যকে সাহায্য করা। অন্যকে সাহায্য করতে থাকলে নিজের সমস্যা সমাধান হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে (অঁঃড়সধঃরপধষষু); নিজের ভেতর দেশপ্রেম জাগে, দেশপ্রেম থেকে নিজের উন্নতি-সমৃদ্ধি ও শান্তি বেড়ে যায়। এজন্যই বলছিলাম, দেশ থেকে কিছু চাওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত দেশকে আমরা কী দিয়েছি। এমন ভাবনা দৃঢ়ভাবে নিজের ভেতর অনুধাবন করতে পারলে সত্যিকার দেশপ্রেম জন্ম নিতে বাধ্য। মাহাথীর মোহাম্মদের বিখ্যাত উক্তি- নেতার বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বলতে কিছু নেই; সবই জনগণের, সবই রাষ্ট্রের। আসুন, এই বক্তব্যের আলোকে আমরাও অনুসরণ করি-
তোর যা কিছু আছে, বিলিয়ে দে সবারে,
বেরিয়ে আয় সবার মাঝে ছেড়ে আপনারে;
ছড়িয়ে পড় প্রত্যেকে তোরা পরের তরে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে- আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং বাস্তবের প্রিয় মাতৃভূমিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার সৃষ্ট জলে ডুবিয়ে না দিয়ে বরং জাতির সকল অন্ধকার তথা দুর্যোগ-দুর্গতি বিদূরিত করে তিলোত্তমারূপে বাংলাদেশকে যদি বিশ্বের বুকে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ বাড়াতেই হবে; এর কোনো বিকল্প নেই। দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ বাড়াতে পরিবারের ভূমিকার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকাও কম নয়। এভাবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ বাড়াতে আজকের আলোচনার কার্যকর অনুশীলনের পথ ধরে আলোকিত জাতি, সমৃদ্ধ দেশ দেখার প্রত্যাশায় আমি দিন গুনছি... 


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ