বিশেষ খবর



বেসরকারি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ নেই গরিব মেধাবীদের

ক্যাম্পাস ডেস্ক মেডিকেল কলেজ

গরিব পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ। টাঙ্গাইলের মধুপুর থানাধীন কাকরাইট গ্রামে তার বাড়ি। গত বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সরকারি মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাননি তিনি। তবে যেখানে সরকারি মেডিকেল কলেজের মেধা স্কোর শেষ তা থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না ফয়সাল আহমেদের মেধা স্কোর। দেশের প্রথম শ্রেণির বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার মেধা স্কোর ছিল তার। কিন্তু উচ্চ ভর্তি ও আনুষঙ্গিক ফি মেটাতে না পেরে তিনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। তার জায়গা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এভাবে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের উচ্চ ফি যোগান দিতে না পেরে প্রতিবছর দরিদ্র পরিবারের সব মেধাবী মুখ মেডিকেল শিক্ষা থেকে এভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ধনী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এমনিতেই বেসরকারি মেডিকেল কলেজের জন্য উচ্চ ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীর এমবিবিএস সম্পন্ন করতে মোট খরচ হবে ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই ফি যোগান দেয়াটাই অনেক শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে। তার ওপর সরকার নির্ধারিত এই ফি মেনে চলে না অধিকাংশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। একজন শিক্ষার্থীর এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা লাগে বলে অভিযোগ করেছেন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। এমবিবিএসের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ৬ অক্টোবর ও বিডিএসের (ডেন্টাল) পরীক্ষা ১০ নভেম্বর হবে। এছাড়া এবার ভর্তির আবেদনে এসএসসি ও এইচএসসিতে মোট জিপিএ-৯ থাকতে হবে। আগে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল জিপিএ-৮। গত বছরের মতো এবারও লিখিত পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর ৪০ বহাল রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা ৩ হাজার ১৬২। অন্যদিকে ৬৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ৫ হাজার ৩২৫টি। সরকারি ৯টি ডেন্টাল কলেজে ৫৩২টি আসন রয়েছে। ২৪টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে আসন ১ হাজার ২৮০টি।
দীর্ঘ সমালোচনা ও আলোচনার পর গত বছর বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি ফি নির্ধারণ করে দেয় সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এক প্রজ্ঞাপনও জারি করে। বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের নিজেদের ইচ্ছামতো বাড়তি অর্থ গ্রহণ ঠেকাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত ওই প্রজ্ঞাপনে জানা যায়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো ভর্তি ফি বাবদ ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা নিতে পারবে। ইন্টার্ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া পাঁচ বছরে মোট টিউশন ফি বাবদ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বেশি গ্রহণ করতে পারবে না। সরকারের পক্ষ থেকে ফি নির্ধারণ করে দেয়ার ফলে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীর এমবিবিএস সম্পন্ন করতে মোট খরচ হবে ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে ইন্টার্ন ফি বাবদ কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে যে টাকা গ্রহণ করবে পরবর্তীতে ইন্টার্নশিপ করার সময় তার লভ্যাংশসহ ফেরত দেবে। অথচ সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি ফি মাত্র ১২ হাজার টাকা (তিন মাসের টিউশন ফিসহ)।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিবছরের মতো এবারও ভর্তি ফি’র বিষয়টি আলোচনায় চলে এসেছে। গত বছর প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শুধু ভর্তি ফি ১৪ লাখ ২০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক কলেজে ভর্তির সুযোগ পেতে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনেক শিক্ষার্থীকে দিতে হয়েছে বাড়তি টাকা। যা কাগজে-কলমে লেখা থাকে না। প্রথম শ্রেণির মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতে অনেক শিক্ষার্থীর গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ভর্তি পরীক্ষার পাশাপাশি ভর্তি ফি নিয়ে এবারও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন অনেক মেডিকেল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। গত সেশনের অভিজ্ঞতা তাদের বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নিজেদের মতো করে বাড়তি ভর্তি ও কোর্স ফি আদায় করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে শিক্ষার নামে বাণিজ্য বসানোর অভিযোগ উঠে আসছে। বিগত শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ফি, উন্নয়ন ব্যয়, বিবিধসহ নামী-বেনামি অনেক খাতের অজুহাত দেখিয়ে চড়া ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা নিয়মের বিষয়টি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
এ বিষয়ে বিএমএ’র সাবেক সভাপতি এবং ডক্টরস ফর হেলথ এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সভাপতি রশিদী-ই মাহবুব জানান, সদিচ্ছা থাকলেই সহনশীল ভর্তি ফি নির্ধারণ করতে পারে সরকার। বৈষম্য দূরীকরণে অতিদ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশে এখনও ভর্তি ফি কম নেয়া হয় বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স এ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডাঃ জামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করা কোনভাবেই লাভজনক নয় বলে এ সেক্টরে বড় বড় ব্যবসায়ীর মুখ দেখা যায় না।
জনকল্যাণমূলক উদ্দেশেই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। তাই ব্যবসায়িক কারণে নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্যই তা করতে হয়। প্রতিষ্ঠান চালানোর চাহিদা ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন বাড়তি টাকা নেয়া হয় না বলে জানিয়েছেন বেসরকারি কলেজের কর্তৃপক্ষরা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ভর্তি ফি হিসেবে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়ে থাকে বলে জানান মহাসচিব ডাঃ জামাল উদ্দিন চৌধুরী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত জানান, একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা খুবই ব্যয়বহুল। ভারতে প্রথম শ্রেণির কয়েকটি কলেজে ভর্তি ফি হিসেবে শিক্ষার্থী প্রতি এক কোটি টাকাও নেয়া হয়ে থাকে বলে তিনি দাবি করেন।


বিশ্ববিদ্যালয় কম্পাস পত্রিকার সংখ্যা সমূহ

আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img