বিশেষ খবর



Upcoming Event

বাংলাদেশী প্রথম স্কটিশ এমপি ফয়সল চৌধুরীর বাংলাদেশ সফরকালে ক্যাম্পাস পত্রিকার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকার

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রিয় মানুষের মুখোমুখি
img

প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে স্কটল্যান্ডের সংসদের সদস্য (এমএসপি) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফয়ছল হোসেন চৌধুরী। তিনি সেখানে স্কটিশ লেবার পার্টির হয়ে লোথিয়ান অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। চলমান করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফয়সলের এই অবিষ্মরণীয় জয়ে উচ্ছ¡সিত গোটা বাঙ্গালী জাতি এবং স্কটল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা। তাঁর জন্ম বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলায়। এর আগে তিনি ২০১৭ সালে ওয়েস্টমিনিস্টার সংসদ নির্বাচনে লেবার পার্টির হয়ে এডিনবার্গ সাউথইস্ট অঞ্চলে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন।

ফয়ছল চৌধুরী পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ২০১৪ সালে স্কটিশ গণভোটের সময় তিনি ‘বাংলাদেশিজ ফর বেটার টুগেদার ক্যাম্পেইন’ এ সহযোগিতা করেন। এছাড়াও ছোটবেলা থেকেই তিনি কমিউনিটি ওয়ার্কের সাথে জড়িত। মানবসেবা ও সমাজসেবা তাঁর হৃদয়ে প্রোথিত। অতি সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত এক সফরে বাংলাদেশে আসেন। এ সফরকালে ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক ড. এম হেলালের সাথে টেলিফোনে একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন। গুরুত্বপূর্ণ এ আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসঃ প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে স্কটিশ পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হওয়ায় আপনার অনুভূতি কী?

ফয়ছল হোসেন চৌধুরীঃ ইতিহাসে একটা স্থান করা এটা সত্যিই অনেক গর্বের। স্কটল্যান্ড পার্লামেন্টে নিজের একটা জায়গা করা, সেখানকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়া; এতে আমি ভীষন আনন্দিত ও গর্বিত। এটি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে স্কটিশ পার্লামেন্টে এবং একই সাথে প্রথম পুরুষ হিসেবে ব্রিটেনে পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার অনন্য সুযোগ। আমি মনে করি যে, এটা সবার দোয়া এবং মানুষের এ দোয়ার কারণেই আমি আজকে এই জায়গাতে আসতে পেরেছি। একজন বাঙালি হিসেবে এই অবস্থানে যেতে আমি পেরে অত্যন্ত সন্মানিত বোধ করছি। ইতিহাসের একটা অংশ হওয়াটাও একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। নিশ্চই কোনো ভাল কাজ আামার পূর্ব পুরুষ করেছে কিংবা আমি করেছি; যে কারণে আল্লাহ আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। এ সুযোগ আমার জন্য অনুপ্রেরণার এবং খুশির।

বি ক্যাঃ একজন বাংলাদেশী হিসেবে স্কটল্যান্ডে রাজনীতি করা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং এমপি নির্বাচিত হওয়া; এর পেছনে কী অনুপ্রেরণা কাজ করেছে?

ফয়ছলঃ সমাজসেবা, লোকদের সাথে কথা বলা, তাদের সাথে মেশা; ভালো কাজ করলে যে সেটার স্বীকৃতি আছে অর্থাৎ ভালো কাজ করলে যে মানুষ সন্মান করে এসবকিছু আমার জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই আমি কমিউনিটি ওয়ার্কের সাথে জড়িত, চ্যারিটি ওয়ার্কের সাথে জড়িত; সমাজসেবা করেছি এবং সবসময়ই মানুষের পাশে থেকেছি। আমি মনে করি যে রাজনীতি করতে গেলে জনগণের সাথে থাকতে হয়, তাদের সুখে-দুঃখে থাকতে হয় এবং আমি এই কাজটা ছোটবেলা থেকেই করে আসছি।

বি ক্যাঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্কটল্যান্ড সফরকালে আপনার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল; সে সাক্ষাৎ সম্পর্কে এবং সাক্ষাৎকালে কী আলোচনা হয়েছিল সে সম্পর্কে পাঠকদের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলতেন?

ফয়ছলঃ জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনাইটেড কিংডমে গিয়েছিলেন। তখন স্কটিশ পার্লামেন্টে তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই এবং তিনি তা একসেপ্ট করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হচ্ছেন প্রথম কোনো বাংলাদেশী সরকার প্রধান, যিনি স্কটিশ পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়েছেন। সব দলের লিডার এবং এমপিরা সেসময়ে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেখানে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এ থেকে উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় চারটি দাবি তুলে ধরেন। প্রধান কার্বন নিঃসরণকারীদের অবশ্যই উচ্চাভিলাষী জাতীয় পরিকল্পনা (এনডিসি) দাখিল এবং বাস্তবায়ন করা, উন্নত দেশগুলোকে অভিযোজন এবং প্রশমনে অর্ধেক অর্ধেক (৫০ঃ৫০) ভিত্তিতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করার প্রতিশ্রæতি পূরণ, উন্নত দেশগুলোকে স্বল্প খরচে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সরবরাহ করা; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের দায়িত্ব নেওয়াসহ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ক্ষতি ও ধ্বংস মোকাবেলা করা।

তিনি আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে নগণ্য অবদান রাখলেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি । বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের দায় ০.৪৭ শতাংশের চেয়েও কম। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। পরে তিনি স্কটল্যান্ড, ব্রিটেন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। আমি রিয়েলি প্রাউড; আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে যে স্কটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্কটিশ পার্লামেন্টে নিয়ে যেতে পেরেছি। তিনি যাওয়াতে তাঁর পরিচিতি এবং স্কটিশ পার্লামেন্টের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়েছে এবং সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে। সামনে আমরা বাংলাদেশ পার্র্লামেন্টের সাথে আরো ক্লোজলি কাজ করবো, রিলেশনশীপ আরো জোড়ালো করবো।

এবারে আমি পারিবারিক সফরে দেশে এসেছি। তারপরেও এদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য কয়েকজন মন্ত্রীর সাথে মিটিং হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে স্কটল্যান্ড এবং ইউনাইটেড কিংডমের সম্পর্ক কিভাবে আরো গতিশীল ও সমুন্নত করা যায় সেবিষয়ে তাঁদের সাথে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।

বি ক্যাঃ বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সেখানকার রাজনীতির মধ্যে কী ধরণের পার্থক্য রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ফয়ছলঃ এদেশের রাজনীতি সম্পর্কে গভীরভাবে আমার তেমন কোনো ধারণা নেই। তবে প্রত্যেক দেশেরই একটা নিজস্ব সংবিধান রয়েছে এবং দেশগুলো সেটিই অনুসরণ করে। আমি মনে করি, আমরা যাঁরা নির্বাচিত হই; আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ জনগণের কথা শোনা, জনগণের সাথে থাকা। স্কটিশ পার্লামেন্টে যখন কেউ নির্বাচিত হয়, তখন তাঁরা আর কোনো দলের নয়, পার্লামেন্টে অন্তর্ভূক্ত প্রত্যেকটা মানুষের জন্য হয়ে যায়। অর্থাৎ তখন সব মানুষের জন্যই তাঁরা সমানভাবে কাজ করে। এটাই সেখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমাকে যে ভোট দিয়েছে অথবা দেয়নাই, কিংবা আমি যে এলাকায় নির্বাচিত হয়েছি সেই এলাকার সকলের সুখ-দুঃখ আমাকে শুনতে হবে, তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখতে হবে। সবার পাশে আমাকে থাকতে হবে। আমি মনে করি এটাই একজন জনপ্রতিনিধির কাজ; সেটা বাংলাদেশ হউক কিংবা ইউনাইটেড কিংডম হউক অথবা দুনিয়ার যে কোনো জায়গায় হউক।

বি ক্যাঃ এদেশ এবং এদেশের মানুষের জন্য কিছু করার আপনার কোন পরিকল্পনা রয়েছে কী?

ফয়ছলঃ নিশ্চই আছে। কারণ আমি যেই এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছি, সেইএলাকায় বাংলাদেশী অনেকে রয়েছেন। তারা বিভিন্ন সময় নানা দাবী-দাওয়া আমার কাছে তুলে ধরেন। অনেকে আমাকে অনেক প্রশ্ন করেছেন; নানাবিধ সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সেই দেশে অনেকেই আছেন যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চায়, দেশের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক গড়তে চায়। সেখানকার অনেকের এদেশে প্রোপার্টি নিয়ে প্রবলেম হচ্ছে, এয়ারপোর্টে হয়রানির শিকার হচ্ছে। যখনই এসব নিয়ে তাঁরা আমার কাছে যায়, তখনই আমাদের কাউন্টার পার্ট বাংলাদেশে যাঁরা রয়েছেন তাদের সাথে সেসবের সমাধানে আলাপ করছি। তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে স্কটল্যান্ডের সম্পর্ক কীভাবে আরো সহজ ও গভীর করা যায় সেবিষয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আমার রয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশী যারা রয়েছে; তাদের যদি ভালো সুবিধা দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশে এসে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করবে, ঘর-বাড়ি রাখবে, আসা যাওয়া নিয়মিত করবে। সেক্ষেত্রে তাদের আসা-যাওয়া যদি রেগুলার থাকে তাহলে দেশে রেমিটেন্সের পরিমাণও বেড়ে যাবে। দেশ ও মানুষের কল্যাণে এজাতীয় যে ইস্যুই আমি দেখছি বা শুনছি, সেগুলোর সমাধানে আলাপ-আলোচনা করছি, কাজ করছি। এটা যেহেতু আমার বাপ-দাদার দেশ তাই এদেশের প্রতি আমার একটা বিশেষ আগ্রহতো রয়েছেই।

বি ক্যাঃ আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যারা বাংলাদেশকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ যদি জানাতেন?

ফয়ছলঃ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যেখানেই যে রয়েছেনা কেন, সেখানে বাংলাদেশ কেন্দ্রীক রাজনীতি ছেড়ে সেদেশের মেইনস্ট্রিম পলিটিকসে জড়িত হওয়া উচিত বলে আমি মরে করি। যেমন যারা ব্রিটেনে রয়েছে তারা বিট্রেনের মেইনস্ট্রিম পলিটিকস করুক, যারা আমেরিকাতে রয়েছে তারা আমেরিকার মেইনস্ট্রিম পলিটিকস করুক। বিশ্বের যে যেখানেই থাকুকনা কেন, সে সেখানকার পলিটিকসে জড়িত হোক। এভাবে আমরা যদি বিদেশের রাজনীতিতে জড়িত হতে পারি তাহলে একই সাথে বাংলাদেশের জন্যও ভালো কিছু করতে পারবো। লন্ডনে বসে বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি করে কোনো লাভ হবেনা। এখন আমরা ব্রিটেনে পাঁচজন পার্লামেন্টারিয়ান রয়েছি। যেকোনো প্রবলেমে আমরা কিন্তু সেখানকার পার্লামেন্টে তা তুলে ধরতে পারবো। অপরপক্ষে আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপি করে সেখানে কি তা করা যাবে?

বি ক্যাঃ আপনার যারা উত্তরসুরী, যাদের নিয়ে ক্যাম্পাস কাজ করছে অর্থাৎ এদেশের ছাত্র-যুবকদের উদ্দেশ্যে আপনার মূল্যবান পরামর্শ যদি জানাতেন? ফয়ছলঃ জনগণের সাথে থাকো, জনগণের কথা শুনো, জনগণের জন্য কাজ করে যাও; তাহলেই সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। আমি মনে করি ঘড়ঃযরহম রং রসঢ়ড়ংংরনষব রহ ঃযরং ড়িৎষফ. আমরা যদি বিদেশে গিয়ে পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে ইলেক্টেড হতে পারি, সেখানকার মেইনস্ট্রিম পলিটিকসে ভালো অবস্থান করতে পারি, কাউন্সিলর হতে পারি; তাহলে তোমরা কেন নয়! কোনো কিছুই চেষ্টার বাহিরে নয়। আমাদের নিয়ত যদি ভালো থাকে, আমরা যদি জনগণের জন্য কাজ করতে চাই তাহলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ আমাকে যতটুকু সন্মান দিয়েছেন, আমি যেন সেই সন্মানটুকু ভালোভাবে ধরে রাখতে পারি। বি ক্যাঃ আপনি বাংলাদেশে আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের সাথে আপনার আলোচনা হয়েছে, সেখানে কী আলোচনা হয়েছে তা যদি পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতেন?

ফয়ছলঃ এটা একটা কার্টেসি ভিজিট ছিল। এখানে আমরা আলোচনা করেছি যে আমাদের রিলেশনশীপ আরো কীভাবে বেটারমেন্ট করা যায়, আরো দৃঢ় করা যায়। আর যদি কোনো ধরণের বিশেষ কিছু করতে হয় তাহলে অবশ্যই অফিসিয়ালি আমিও আসবো এবং তাঁদেরকেও সেখানে নিয়ে যাবো। সাক্ষাতের প্রধান বিষয়টিই ছিল রিলেশনশীপ বিল্ডিং। কারণ সুসম্পর্ক থাকলে যে কারো সুখে-দুখে একে অপরের পাশে দাড়ানো যায়। তাই বর্তমান সম্পর্কটাকে কীভাবে আরো সুসংহত করা যায় মূলত সে বিষয়েই আমাদের আলোচনা হয়েছে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ